আমাদের প্যারিসের গল্প
আমাদের প্যারিসের গল্প
নাসিম সাহনিক
প্যারিসের আকাশ সেদিন ছিল অদ্ভুত রকমের নীল। জানালার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো ঢুকে পড়ছিল ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের বসার ঘরে। নাসির ক্যামেরার সামনে বসে আছে। ক্যামেরার লাল আলো জ্বলছে—রেকর্ডিং শুরু হয়েছে। পাশের সোফায় মেরি বসে ল্যাপটপ খুলে ইউটিউবের লাইভ চ্যাট দেখছে। আর ঘরের মাঝখানে মেঝেতে তাদের দুই সন্তান—ইয়ান আর লিনা—খেলনায় মগ্ন। নাসির একটু গলা খাঁকারি দিয়ে হাসল। “বন্ধুরা,” সে বাংলায় বলতে শুরু করল, “আজকে তোমাদের সঙ্গে একটু ব্যক্তিগত গল্প শেয়ার করতে চাই। এই প্যারিসে আমার প্রবাসী জীবনের শুরুটা কেমন ছিল, কীভাবে টিকে ছিলাম, আর কীভাবে মেরির সঙ্গে আমার পরিচয়…” মেরি চোখ তুলে তাকাল, মুচকি হেসে মাথা নাড়ল—বলছে, শুরু করো। নাসিেরর চোখের দৃষ্টি যেন হঠাৎ করেই ক্যামেরা ছাড়িয়ে বহু দূরে চলে গেল। দশ বছর আগের সেই দিনগুলো, সেই অজানা ভয় আর স্বপ্নের স্মৃতি ধীরে ধীরে তার মনে ভেসে উঠল।
১
দশ বছর আগে ঢাকার আকাশও এমনই ছিল, তবে তখন নীলের সঙ্গে মিশে ছিল অনিশ্চয়তার ছায়া। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিড়ের মধ্যে নাসির একা দাঁড়িয়ে ছিল। কাঁধে একটি পুরনো ব্যাকপ্যাক, ভেতরে কয়েকটা জামা, কিছু বই আর মায়ের হাতের লেখা দোয়ার কাগজ। নাসির তখন সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাতে পেয়েই মনে হয়েছিল—এই দেশে থেকে আর এগোনো যাবে না। কাজের সুযোগ কম, প্রতিযোগিতা বেশি। ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা আর কাজের স্বপ্নটা বহুদিনের। অনেক কাগজপত্র, অনেক অপেক্ষা আর ঋণের বোঝা নিয়ে অবশেষে সে সুযোগটা পেয়েছিল। মা চোখ মুছছিল, বাবা শক্ত গলায় বলেছিলেন, “ভয় পাস না। আল্লাহ ভরসা।” নাসির জানত, এই যাত্রা শুধু ভৌগোলিক নয়—এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
২
প্যারিস তাকে প্রথমে স্বাগত জানায় না। শীতল আবহাওয়া, অচেনা ভাষা, ব্যস্ত মানুষ—সব মিলিয়ে শহরটা ছিল নিষ্ঠুর ও নির্দয়। ছাত্রাবাসের ছোট ঘরে প্রথম কয়েক রাত ঘুম আসেনি তার। জানালার বাইরে আলো ঝলমলে শহর, আর ভেতরে একা বসে থাকা এক তরুণ—যার পকেটে স্বপ্ন আছে, কিন্তু টাকা নেই। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ না করলে চলবে না। কিন্তু কাজ পাওয়া সহজ ছিল না। ফরাসি ভাষা তখনো ভাঙা ভাঙা। অবশেষে একটি ছোট রেস্টুরেন্টে ডিশওয়াশারের কাজ জোটে। বেতন কম, কাজ কঠিন—তবু সেটাই ছিল বাঁচার পথ। প্রতিদিন ভোরে উঠে কাজ, তারপর ক্লাস, আবার কাজ। হাতের চামড়া উঠে যেত, পিঠ ব্যথায় কুঁকড়ে থাকত। তবু নাসির হাল ছাড়েনি। সে বিশ্বাস করত—এই কষ্টই একদিন তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
৩
সেই রেস্টুরেন্টেই প্রথম দেখা হয় মেরির সঙ্গে। এক সন্ধ্যায় ব্যস্ত কিচেনে কাজ করতে করতে হঠাৎ কেউ একজন তাকে ফরাসিতে কিছু জিজ্ঞেস করে। নাসির ঠিক বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি হাসে। “তুমি নতুন, তাই না?”—এবার ইংরেজিতে বলে সে। নাসির একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ। আমি নাসির।” “আমি মেরি,” মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দেয়। মেরি ছিল রেস্টুরেন্টের সুপারভাইজার। ফরাসি হলেও তার ব্যবহার ছিল অদ্ভুত রকমের সহজ। সে নাসিরকে ধৈর্য নিয়ে কাজ শেখাত, ভুল হলে বকত না। ধীরে ধীরে নাসিরে##বছরের প্রথমদিনে টফি ওটিটি প্লাটফর্মে এলো বন্ধুত্বটা শুরু হয় ছোট ছোট কথায়—কফি ব্রেকের সময়, কাজ শেষে বাস ধরার আগে। মেরি জানতে চেয়েছিল বাংলাদেশ কেমন দেশ, নাসির তাকে বলেছিল নদী, সবুজ আর মানুষের গল্প। নাসির জানতে চেয়েছিল প্যারিসের আসল রূপ কেমন, মেরি বলেছিল—এই শহর শুধু প্রেমের নয়, লড়াইয়েরও।
৪
সময় গড়াতে গড়াতে বন্ধুত্বটা অন্য রূপ নিতে শুরু করে। একদিন সন্ধ্যায় কাজ শেষে মেরি নাসিরকে সেঁন নদীর ধারে হাঁটতে নিয়ে যায়। চারপাশে আলো ঝলমল, বাতাসে হালকা শীত। “তুমি খুব শক্ত মানুষ,” মেরি হঠাৎ বলেছিল। “আমি?” নাসির অবাক হয়েছিল। “হ্যাঁ। এত দূর দেশ থেকে এসে একা লড়ছ। সবাই পারে না।” নাসির প্রথমবার অনুভব করেছিল—এই শহরে কেউ একজন সত্যিই তাকে বুঝছে। প্রেমটা তারা ঘোষণা করে শুরু করেনি। সেটা নিজে নিজেই গড়ে উঠেছিল—ভরসা, সম্মান আর ভালোবাসার ভিতের ওপর।
৫
বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। দুই সংস্কৃতি, দুই পরিবার, নানা প্রশ্ন। নাসিেরের পরিবার চিন্তিত ছিল—ভিন্ন দেশের মেয়ে, ভিন্ন জীবনধারা। মেরির পরিবারও শুরুতে দ্বিধায় ছিল। কিন্তু নাসির আর মেরি জানত, তারা একে অপরের পাশে থাকতে পারবে। ছোট একটা রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ে হয়। কোনো জাঁকজমক নয়, শুধু কয়েকজন বন্ধু আর দুই হাত ভর্তি ভালোবাসা। সেই দিন নাসির প্রথমবার অনুভব করেছিল—এই শহরটা আর অচেনা নয়।
৬
সংসার শুরু হয় ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে। টাকা কম, স্বপ্ন বড়। নাসির ধীরে ধীরে নিজের পেশাগত জায়গা তৈরি করে নেয়। মেরি কাজের পাশাপাশি সংসার সামলায়। কয়েক বছরের মধ্যে আসে ইয়ান, তারপর লিনা। বাচ্চাদের হাসিতে ঘর ভরে ওঠে। ক্লান্ত দিন শেষে নাসির যখন ঘরে ফেরে, তখন সব কষ্ট যেন হালকা হয়ে যায়। এই সময়েই ভ্লগিংয়ের ভাবনাটা আসে। প্রথমে শুধু পরিবার আর বন্ধুদের জন্য ভিডিও বানাত। প্রবাসী জীবনের ছোট গল্প, রান্না, বাচ্চাদের স্কুল—সবই ছিল সাধারণ। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শক বাড়তে থাকে। মানুষ নাসিেরের গল্পে নিজেকে খুঁজে পায়—প্রবাসী সংগ্রাম, আন্তঃসংস্কৃতির ভালোবাসা, বাস্তব জীবন।
৭
সেদিনের ভ্লগটা ছিল আলাদা। নাসির তার জীবনের শুরুটা খুলে বলেছিল। কষ্টের কথা, ভয়, ব্যর্থতা—সবকিছু। মেরি পাশে বসে মাঝে মাঝে যোগ করছিল তার দৃষ্টিভঙ্গি। ভিডিও আপলোডের পর তারা ভাবেনি এত সাড়া পাবে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার ভিউ, শত শত মন্তব্য। কেউ লিখেছে—“আপনার গল্প আমাদের সাহস দেয়।” কেউ লিখেছে—“প্রবাসে থেকেও এত মানবিক থাকা যায়, আজ জানলাম।” নাসির মোবাইল নামিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। চোখে জল এসে গিয়েছিল। মেরি তার হাত ধরেছিল। “দেখো,” সে বলেছিল, “তোমার কষ্ট বৃথা যায়নি।”
৮
পার্কে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল তারা চারজন। ইয়ান ঘাসে দৌড়াচ্ছে, লিনা মায়ের কোলে মাথা রেখে আছে। নাসির মনে মনে ভাবল—দশ বছর আগে সে জানত না ভবিষ্যৎ কেমন হবে। শুধু জানত, এগোতে হবে। আজ সে জানে—ভবিষ্যৎ মানে শুধু সাফল্য নয়, পরিবার, ভালোবাসা আর নিজের গল্পকে সত্য করে তোলা। প্যারিসের আকাশে আলো নিভে আসছিল। শহরটা আবার জ্বলে উঠবে রাতে। আর নাসির জানত—তার গল্প এখানেই শেষ নয়। এটা তো কেবল শুরু।
রিভেরিয়া ড্রিমস
রিভেরিয়া ড্রিমস
নাসিম সাহনিক
ফ্রান্সের দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির ধারে বিস্তৃত শহর— ফ্রেঞ্চ রিভেরিয়া। সূর্য এখানে ওঠে যেন সোনার তুলিতে আঁকা এক...
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:২৯ AM২০২৫ সালের ১০টি উল্লেখযোগ্য ফরাসি চলচ্চিত্র
নাসিম আহমেদ
নিচে ২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বা আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত ১০টি সবচেয়ে চিন্তাশীল ও প্রভাবশালী ফরাসি চলচ্চিত্রের তালিকা দেওয়া হলো — প্রতিটির সংক্ষিপ্ত কাহিনি, থিম...
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:০৯ AM২০২৫ — ফরাসি সিনেমায় নতুন ভাবনায় এক যাত্রা
নাসিম আহমেদ.
২০২৫ সাল ফরাসি সিনেমার জন্য একটি উত্সাহী ও পরিপ্রেক্ষিতগত বছর। ক্লাসিক সাহিত্য থেকে আধুনিক সামাজিক বিষয়, পারিবারিক সংকট থেকে একান্ত ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ যাত্রা — এখানে...
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৫:৫০ AMপ্যারিস : ইতিহাস, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলন
অনলাইন ডেস্ক.
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস বিশ্বজুড়ে পরিচিত “City of Light” বা “আলোক নগরী” হিসেবে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, স্থাপত্য, ফ্যাশন এবং রোমান্স—এই সবকিছুর মিলনে প্যারিস এক অনন্য...
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০৩:৩৭ AMলুভর মিউজিয়াম: শিল্প, ইতিহাস ও সভ্যতার মহাগ্রন্থ
অনলাইন ডেস্ক.
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্প জাদুঘর বলতে হলে নিঃসন্দেহে প্রথমেই যে স্থানের নাম উঠে আসে তা হলো ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের লুভর মিউজিয়াম। এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়—এটি...
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ০৩:১৮ AMতারুণ্যের ফ্যাশন
স্টাফ রিপোর্টার.
নিজেকে রুচিশীল হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তরুণীরা বরাবরই চেষ্টা করে থাকে। এজন্য বাজার ঘুরে ফ্যাশনাবল পোশাকগুলোকেই তারা বেছে নেয়। ফ্যাশন...
বাংলাদেশের ২০২৫ সালের সেরা ১০ চলচ্চিত্র: শিল্প, দর্শক ও পরিবর্তনের ধারা
স্টাফ রিপোর্টার।
২০২৫ সালটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। শিল্পী, নির্মাতা ও প্রযোজকরা বিভিন্ন ঘরানায় নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে দর্শকের...
১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৪:০৮ PMদক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৫ সালের চলচ্চিত্র
স্টাফ রিপোর্টার.
দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই চলচ্চিত্রের জগতে বিশেষ অবস্থানে রয়েছে। কো-সিনেমা (K-Cinema) শুধু নিজ দেশে নয়, আন্তর্জাতিক ফেস্টিভাল, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং...
১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৩:২৮ PMরিভেরিয়া ড্রিমস
রিভেরিয়া ড্রিমস
নাসিম সাহনিক
ফ্রান্সের দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির ধারে বিস্তৃত শহর— ফ্রেঞ্চ রিভেরিয়া। সূর্য এখানে ওঠে যেন সোনার তুলিতে আঁকা এক...
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:২৯ AM২০২৫ সালের ১০টি উল্লেখযোগ্য ফরাসি চলচ্চিত্র
নাসিম আহমেদ
নিচে ২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বা আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত ১০টি সবচেয়ে চিন্তাশীল ও প্রভাবশালী ফরাসি চলচ্চিত্রের তালিকা দেওয়া হলো — প্রতিটির সংক্ষিপ্ত কাহিনি, থিম...
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:০৯ AM