স্মার্টফোন, পর্নোগ্রাফি ও যৌন সহিংসতা: বাংলাদেশের সমাজে নতুন উদ্বেগ
আহম্মদ শুভ.
বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ধর্ষণের পর শিশু হত্যা, পরিচিত বা প্রতিবেশীর হাতে শিশুর নির্যাতন এবং নিরাপদ বলে বিবেচিত জায়গায় শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে প্রায় ৫০টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিল ইউনিসেফ। ২০২৬ সালেও একাধিক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আদালতে বিচার ও দণ্ডের খবর এসেছে। যেমন, ময়মনসিংহে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—সমাজে যৌন অপরাধের প্রবণতা কেন বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে? স্মার্টফোন, সহজ ইন্টারনেটপ্রাপ্তি এবং পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বিস্তার কি এর সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর উত্তর দিতে হলে আবেগের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক সতর্কতাও প্রয়োজন।
পর্নোগ্রাফি দেখাকে ধর্ষণের সরাসরি কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশভিত্তিক প্রমাণ নেই। একইভাবে কোনো অপরাধী পর্নোগ্রাফি দেখেছে বলেই সে অপরাধ করেছে—এমন সরল কারণ-ফল সম্পর্কও তৈরি করা যায় না। যৌন সহিংসতার পেছনে ব্যক্তির যৌন আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীবিদ্বেষ, শিশুর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, অপরাধপ্রবণতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, শাস্তির ভয় না থাকা এবং ভুক্তভোগীর অসহায় অবস্থাসহ বহু বিষয় কাজ করতে পারে। তাই পর্নোগ্রাফিকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলে সমস্যার প্রকৃত বহুমাত্রিক চরিত্র আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
তবে ডিজিটাল পরিবেশকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। স্মার্টফোনের কারণে যৌন কনটেন্ট এখন আগের তুলনায় অনেক সহজলভ্য। WHO-এর সাম্প্রতিক আলোচনাতেও যৌন সহিংসতার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতা পরিমাপ ও বোঝার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে পুরোনো একটি WHO আঞ্চলিক প্রতিবেদনে পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শের কথাও উঠে এসেছিল। তবে সেই তথ্য বর্তমান বাংলাদেশের সব বয়সী মানুষের আচরণ বা ২০২৬ সালের পরিস্থিতির সরাসরি পরিমাপক নয়।
এখানেই নৈতিক শিক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পর্নোগ্রাফির একটি অংশে যৌন সম্পর্ককে পারস্পরিক সম্মতি, মর্যাদা ও মানবিকতার পরিবর্তে ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। কেউ যদি এসব কনটেন্টকে বাস্তব জীবনের যৌন সম্পর্কের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে তার মধ্যে সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমা ও অন্য মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। কিন্তু এই ঝুঁকি ব্যক্তি ও কনটেন্টভেদে ভিন্ন; এটিকে প্রত্যেক দর্শকের অপরাধপ্রবণতার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুদের নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, অপরাধী শিশুর পরিচিত বা আশপাশের মানুষও হতে পারে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ বলেছিল, বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনায় অপরাধীরা অনেক সময় ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তি হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের মে মাসে ইউনিসেফও শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যাসহ সহিংসতার ঘটনায় পরিবার, স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, প্রতিবেশ ও অন্যান্য যত্নের পরিবেশে সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
তাই শুধু স্মার্টফোন বন্ধ করে বা পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। প্রথমত, শিশু ও কিশোরদের বয়সোপযোগী যৌনতা, ব্যক্তিগত সীমা, সম্মতি এবং নিরাপদ-অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের সন্তানদের ডিজিটাল জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তৃতীয়ত, পর্নোগ্রাফি বা যৌন কনটেন্টে শিশুদের প্রবেশ ঠেকাতে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সার্চ, parental controls এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও প্রয়োজন নৈতিক ও নাগরিক শিক্ষা। যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকা অপরাধ নয়; কিন্তু অন্যের সম্মতি ছাড়া যৌন আচরণ অপরাধ। বয়স, সামাজিক অবস্থান বা পারিবারিক পরিচয় কাউকে অন্যের শরীর ও মর্যাদার ওপর অধিকার দেয় না। বিশেষ করে শিশু কোনোভাবেই যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতি দেওয়ার অবস্থানে নেই—এই মৌলিক বিষয়টি সমাজের প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট করতে হবে।
আইনের প্রয়োগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের তদন্ত দ্রুত ও পেশাদার হতে হবে, ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার কয়েকটি মামলায় দ্রুত বিচার ও দণ্ডের খবর এলেও এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ—যেমন উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদন—আলাদা বিষয় হিসেবে চলতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ধর্ষণ কোনো প্রযুক্তির সমস্যা মাত্র নয়; এটি মূলত ক্ষমতা, সম্মতি, মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সুরক্ষা ও আইনের প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুতর অপরাধ। স্মার্টফোন ও পর্নোগ্রাফির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতা প্রয়োজন, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া এগুলোকে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার সরাসরি কারণ ঘোষণা করলে প্রকৃত অপরাধের সামাজিক ও কাঠামোগত কারণগুলো আড়ালে চলে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—ডিজিটাল নিরাপত্তা, নৈতিক শিক্ষা, শিশুর সুরক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার এবং অপরাধ প্রতিরোধকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং পুরো সমাজের।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক
রাজা প্রতাপাদিত্য ও পর্তুগিজদের সম্পর্ক
বাংলার ইতিহাসে যশোরের শাসক রাজা প্রতাপাদিত্য একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ষোড়শ শতকের শেষভাগ ও সপ্তদশ শতকের শুরুতে বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিত...
জুলাই স্মৃতি
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই দুপুরে মৃত্যুবরণ করে শহীদ হন ঢাকা রেসিডেন্টশিয়াল মডেল কলেজের সবে মাত্র প্রথম বর্ষ শেষ করা ১৭ বছরের কিশোর ফারহান ফাইয়াজ। সেই মৃত্যু সচেতন সকল মহলকে প্রচুর কষ্ট...
১৮ জুলাই ২০২৬ ০৪:৩৮ PMআবাসিক মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও বলাৎকার: সমাজের জন্য এক ভয়াবহ সংকট
বাংলাদেশ একটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম দেশ। এ দেশের মানুষ ইসলাম ধর্মের মূল্যবোধকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করে। ইসলাম শান্তি, মানবতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার ধর্ম। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি...
০২ জুন ২০২৬ ০১:১৪ PMবাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকারের ভয়াবহ বিস্তার, কারণ ও প্রতিকার
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকার বর্তমানে এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু নির্যাতনের নানা মর্মান্তিক খবর প্রকাশিত...
২৬ মে ২০২৬ ০৪:৫১ PMবাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
স্টাফ রিপোর্টার.
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় যানবাহন। দ্রুত চলাচল, কম খরচ এবং সহজে যেকোনো স্থানে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ...
নাসিম সাহনিকের লেখা সুর আর পরিচালনায় নতুন মিউজিক্যাল ফিল্ম
বাংলা সংগীত ও দৃশ্যশিল্পের সমন্বিত ধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে মিউজিক্যাল ফিল্ম ‘হারানো সেই দিনগুলি’। নস্টালজিয়া, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের আবেগকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই মিউজিক্যাল...
বৃষ্টির দিনে...
স্টাফ রিপোর্টার.
বর্ষাকাল বাংলাদেশের প্রকৃতিকে এক অনন্য সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে। আকাশজুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা, টিপটিপ কিংবা ঝুম বৃষ্টি, গাছপালার ধুয়ে যাওয়া সবুজ রূপ এবং ভেজা মাটির সোঁদা...
মাছরাঙা টিভির ১৫ বছর: সৃজনশীলতা, সংবাদ ও বিনোদনের গৌরবময় অভিযাত্রা
মাছরাঙা টিভির ১৫ বছর: সৃজনশীলতা, সংবাদ ও বিনোদনের গৌরবময় অভিযাত্রা
বাংলাদেশের বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন শিল্প গত দুই দশকে যে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে কয়েকটি...
রাজা প্রতাপাদিত্য ও পর্তুগিজদের সম্পর্ক
বাংলার ইতিহাসে যশোরের শাসক রাজা প্রতাপাদিত্য একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ষোড়শ শতকের শেষভাগ ও সপ্তদশ শতকের শুরুতে বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিত...
শহীদ ফারহান ফাইয়াজকে নিজ কলেজে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ
স্টাফ রিপোর্টার.
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, জুলাই এলেই শুধু বিভিন্ন...
১৯ জুলাই ২০২৬ ০৯:৫১ PM